ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা সিটিতে হামলা জোরদার করেছে, যা তাদের সম্প্রসারিত অভিযানের অংশ হিসেবে এই উপত্যকার শেষ প্রধান জনবহুল এলাকা দখলের লক্ষ্য নিয়ে চালানো হচ্ছে। এতে ক্ষুধার্ত হাজারো ফিলিস্তিনি আবারও পালাতে বাধ্য হচ্ছে। গাজা সিটির জেইতুন, সাবরা, রিমাল ও তুফাহ পাড়া সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের প্রধান শিকার হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক দক্ষিণ গাজায় সরিয়ে নেওয়ার ইসরায়েলি পরিকল্পনা তাদের কষ্ট আরো বাড়াবে।
হাজার হাজার পরিবার জেইতুন এলাকা থেকে পালিয়েছে, যেখানে টানা কয়েক দিনের হামলায় এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজা সিটির আল-আহলি আরব হাসপাতালে রবিবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছে।
এ ছাড়া সেনাবাহিনী এদিন জানায়, গত ২২ মাসের যুদ্ধে বহুবার বাস্তুচ্যুত হওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য তাঁবু ও আশ্রয় তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। তবে একাধিক মানবাধিকার সংস্থা এটিকে গণহত্যার কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আরো পড়ুন

গাজাবাসীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ইস্যু স্থগিত
আলজাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খৌদারি গাজার মধ্যাঞ্চলীয় দেইর এল-বালাহ থেকে প্রতিবেদন করছিলেন। তিনি জানান, গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা অনেককে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘জেইতুন একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে বহু পরিবার থাকে, তাদের মধ্যে অনেকে আশ্রয়ের খোঁজে এখানে এসেছিল। হঠাৎ করে গোলাবর্ষণ ও তীব্র বিমান হামলা শুরু হলে বাসিন্দারা বিস্মিত হয়।কেউ কেউ রয়ে যায়, কেউ চলতে শুরু করে। সহিংসতা বাড়তে থাকলে অনেকেই ক্ষুধার্ত, বিধ্বস্ত ও আবারও বাস্তুচ্যুত হয়ে সব কিছু ফেলে পালাতে বাধ্য হয়।’
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ঘোষণা করে, তারা গাজা সিটিতে আরো গভীরে প্রবেশ করবে এবং বাসিন্দাদের দক্ষিণে সরিয়ে দেবে। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নিন্দার জন্ম দেয়। যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওয়ারেন্টভুক্ত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, বেসামরিক লোকজনকে ‘নিরাপদ অঞ্চলে’ সরানো হবে, যদিও এই এলাকাগুলোও বহুবার বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে।
গাজার ২৪ লাখ ফিলিস্তিনির প্রায় ৯০ শতাংশ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের বিপুলসংখ্যক এখন অনাহারের মুখে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রবিবার জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় অনাহারে আরো সাতজন ফিলিস্তিনি মারা গেছে। এতে অবরোধের কারণে ক্ষুধাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৮, যার মধ্যে ১১০ শিশুও রয়েছে।
এ ছাড়া ইসরায়েল রবিবারই প্রায় ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যাদের প্রায় অর্ধেকই ছিল ত্রাণপ্রত্যাশী। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে মোট নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৮২৭ জনে।

চিকিৎসার জন্য ইতালিতে নেওয়া ফিলিস্তিনি তরুণীর মৃত্যু
এদিকে হামাস দক্ষিণে তাঁবু স্থাপনের ইসরায়েলি পরিকল্পনাকে গণহারে বাস্তুচ্যুতির আড়াল বলে নিন্দা করেছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, এই পদক্ষেপ আসলে ‘গণহত্যা ও বাস্তুচ্যুতির নতুন ঢেউ’, যা ‘একটি জঘন্য অপরাধকে আড়াল করার জন্য স্পষ্ট প্রতারণা’।
ইসরায়েলের সর্বশেষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির আদেশে গাজায় হতাশার বাতাবরণ ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে আলজাজিরার অনলাইন সংবাদদাতা মারাম হুমাইদ এক্সে লিখেছেন, ‘গাজাবাসী এখন কেমন অনুভব করছে তা বর্ণনা করার মতো শব্দ নেই। সবার ভেতরে ভয়, অসহায়ত্ব আর যন্ত্রণায় ভরা। কারণ তারা নতুন এক বাস্তুচ্যুতি আর ইসরায়েলি স্থল অভিযানের মুখোমুখি। পরিবার ও বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ নীরব আর্তনাদ ও শোকে পূর্ণ। আল্লাহ জানেন, মানুষ যথেষ্ট ভুগেছে। আমাদের চিন্তাশক্তি প্রায় অবশ হয়ে গেছে।’
এদিকে বাস্তুচ্যুত ও হতাশ ফিলিস্তিনিরা খাবারের টুকরো খুঁজে ফিরছে, আরেক দিকে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, গাজার প্রতি পাঁচ শিশুর একজন অপুষ্টিতে ভুগছে। লাখো মানুষ দাতব্য রান্নাঘরের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে অল্প পরিমাণ খাবারই তাদের দিনের একমাত্র আহার।
জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত জেইনাব নাবাহান আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমি সকাল ৬টায় দাতব্য রান্নাঘরে এসেছি আমার সন্তানদের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে। যদি এখন না পাই, তবে আবার সন্ধ্যায় চেষ্টা করতে হবে। আমার সন্তানরা সামান্য ডাল বা ভাত খেয়ে অনাহারে আছে। তারা রুটি বা কোনো নাশতা পায়নি। তারা অপেক্ষা করছে আমি যেন দাতব্য রান্নাঘর থেকে কিছু এনে দিতে পারি।’
আরো পড়ুন
অন্য বাসিন্দা তায়সির নাঈম আলজাজিরাকে বলেন, ‘আল্লাহ আর দাতব্য রান্নাঘর না থাকলে আমি বাঁচতাম না। আমরা সকাল ৮টায় এখানে আসি, কষ্ট করে ডাল বা ভাত সংগ্রহ করি। অনেক কষ্ট করি, দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করি এবং প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ফিরি।’
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) রবিবার সতর্ক করে বলেছে, গাজা ‘মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ’র মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে তারা জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন বিতরণ ব্যবস্থায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির যোগাযোগ পরিচালক জুলিয়েট তৌমা এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘আমরা আমাদের সম্মিলিত মানবতা হারানোর খুব কাছাকাছি।’
তিনি আরো বলেন, এই সংকট ‘রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জিএইচএফের মাধ্যমে জাতিসংঘ সমন্বিত মানবিক ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপনের সচেতন প্রচেষ্টার’ ফল। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে দেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারিত বিকল্প ব্যবস্থা ‘অমানবিকতা, বিশৃঙ্খলা ও মৃত্যু’ বয়ে আনছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই একটি ঐক্যবদ্ধ, জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন সমন্বয় ও বিতরণ ব্যবস্থায় ফিরতে হবে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ভিত্তিতে। এই জঘন্যতা শেষ হতে হবে।’
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলছে, তাদের দলগুলো গাজায় খাদ্য সহায়তা পৌঁছাতে ‘সব কিছু করছে’, তবে বর্তমান সরবরাহ লক্ষ্য মাত্রার মাত্র ৪৭ শতাংশ পূরণ করছে। জাতিসংঘ সংস্থার মতে, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এখন ‘দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে’ এবং কেবল যুদ্ধবিরতিই খাদ্য সহায়তা প্রয়োজনীয় মাত্রায় বাড়াতে সক্ষম করবে।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় বলেছে, ইসরায়েল সচেতনভাবে শিশুখাদ্য, পুষ্টিকর সাপ্লিমেন্ট, মাংস, মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য ও হিমায়িত ফল-সবজির মতো অপরিহার্য জিনিস আটকে রেখে ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রাখছে। টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ইসরায়েল ‘গাজার ২৪ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অনাহার ও ধীরে হত্যার নীতি বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে রয়েছে ১২ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশু। এটি পূর্ণমাত্রার গণহত্যার অপরাধ।’
বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে, ৪০ হাজারের বেশি শিশু গুরুতর অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে, আর অন্তত এক লাখ শিশু ও রোগী একই অবস্থায় ভুগছে।
গাজা সিটির ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাওয়া আলজাজিরাকে বলেন, সব ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে সহায়তাকর্মীরা সাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আরো পড়ুন

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা…এই সামাজিক কাঠামোর অংশ। আমরা এখানকার মানুষের সঙ্গে যুক্ত, আর আমরা তাদের সঙ্গেই থাকছি, যদিও ইসরায়েল গাজা সিটি জোরপূর্বক খালি করা ও গাজার বাকি অংশ ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে। এখানে ১১ লাখ মানুষ আছে, যাদের বেশির ভাগই প্রবীণ, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী।’
আমজাদ বলেন, কর্মীরা সীমিত খাবার, চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষা দেওয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সতর্ক করেন, ‘মানবিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে’, কারণ ইসরায়েল সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাচ্ছে এবং সরবরাহ সীমিত করছে।













