মহান একুশে বইমেলায় অংশ নিবে না ৩৫০ প্রকাশনী। বাংলা একাডেমীর ডি. জি’র পদত্যাগ চায় ‘প্রকাশক ঐক্য’। বাংলা একাডেমীর চরম অব্যবস্থাপনা ও বৈষম্য অনেক বছর ধরে চলছে।
নানাবিধ অনিয়ম ও অযোগ্যতার কারণে এই অচল অবস্থা। বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা হয়। বইমেলার মতো বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নিয়ে চরম ব্যস্ত থাকে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা । ফলঃত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যস্ত থেকে মূল বাংলা ভাষার উন্নয়নের কাজটি করার সময়ই হয় না বাংলা একাডেমীর।
মেলা করা বাংলা একাডেমির মূল কাজ নয়। এই বছর নানা জটিলতা প্রথম থেকে তৈরি করে বাংলা একাডেমি। এখনো প্রকাশকদের লটারি করে জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়নি। অথচ স্টল বানানোর আর সময় নাই।
মেলার মাঠে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের অস্বচ্ছতা নিরসন না হওয়া এবং বাংলা একাডেমীর গাফিলতিতে চরম সময় স্বল্পতা কারণে আসন্ন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এ অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্ম ‘প্রকাশক ঐক্য’।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যমকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে ‘প্রকাশক ঐক্য’ এর বক্তব্যটি হুবুহু তুলে ধরা হলো-
অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ের সাথে দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্ম ‘প্রকাশক ঐক্য’ জানাচ্ছে যে, মেলার মাঠে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের অস্বচ্ছতা নিরসন না হওয়া এবং চরম সময়স্বল্পতার কারণে আসন্ন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এ আমাদের পক্ষে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
আমরা সবসময়ই কর্তৃপক্ষ ও নতুন সরকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে চেয়েছি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার পর, কেবল নতুন সরকারের প্রতি শুভেচ্ছার্থে এবং তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা আমাদের মূল দাবি (ঈদের পর মেলা আয়োজন) থেকে সরে আসি। নিশ্চিত ব্যবসায়িক ক্ষতি জেনেও আমরা মেলায় অংশগ্রহণের দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিই এবং ১৯ তারিখের মধ্যে মেলার আবেদন সম্পন্ন করি।
‘প্রকাশক ঐক্য’-এর সাথে যুক্ত ৩ শতাধিক সাধারণ প্রকাশককে এই স্বল্প সময়ে বইমেলায় অংশগ্রহণের বিষয়ে রাজি করাতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তাদের উত্থাপিত দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কথা দিয়েছিলাম যে, এবারের বইমেলায় সমঅধিকারের স্বার্থে আমরা নিজেরা কোনো প্যাভিলিয়ন নেব না এবং অন্য কারও প্যাভিলিয়নও থাকবে না। এটি মূলত সর্বস্তরের প্রকাশকের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
বুধবারের (১৮ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিক মিটিংয়ের আগে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক (ডিজি) মহোদয়ের সাথে যে যৌক্তিক দাবিগুলোর বিষয়ে আমাদের মৌখিক সমঝোতা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল: সমস্ত প্যাভিলিয়ন বাতিল করে সবাইকে সমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া। এই দাবির পেছনের যৌক্তিক কারণগুলো হলো:
• চরম সময়স্বল্পতা: একটি প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করতে কমপক্ষে ১০ দিন সময় লাগে। মেলা শুরু হতে মাত্র ৪ দিন বাকি। মূলধারার ও শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড প্রকাশকদের প্রায় ৯০ ভাগই ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পূর্ববর্তী বয়কটের কারণে তারা মেলার প্রস্তুতি থেকে বিরত ছিলেন। এখন সময়ের অভাবে এই শীর্ষ প্রকাশকরা বাধ্য হয়ে স্টল নিচ্ছেন। অন্যদিকে, প্যাভিলিয়নের প্রকৃত দাবিদার যে প্রকাশকরা কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মেলায় ফিরতে সম্মত হয়েছিলেন, উদ্বোধনের মাত্র ৩-৪ দিন আগে তাদের পক্ষেও কোনোভাবেই প্যাভিলিয়নের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করা বাস্তবসম্মত নয়।
• অস্বচ্ছ বরাদ্দ ও অমর্যাদা: ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর কর্মসূচি চলাকালীন বাংলা একাডেমি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনেক অপ্রধান বা অযোগ্য প্রকাশককে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয় এবং তারা নির্মাণকাজ এগিয়ে নেন। এমতাবস্থায়, অযোগ্যদের প্যাভিলিয়নের বিপরীতে ছোট স্টল নিয়ে যেনতেনভাবে মেলায় অংশ নেওয়া মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশকদের জন্য চরম অমর্যাদাকর।
• অন্যায্য সুবিধা ও বৈষম্য: যেসব প্রকাশক বৃহত্তর ঐক্যের বাইরে গিয়ে প্যাভিলিয়ন নিয়েছিলেন, তারা সরকারের ভর্তুকি ছাড়াই ফি দিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর আন্দোলনের ফলেই সরকার শতভাগ স্টলভাড়া মওকুফ করেছে এবং সেই সুবিধা এখন প্যাভিলিয়নধারীরাও ভোগ করবেন। অথচ মেলার প্রস্তুতিতে তারা পূর্ব থেকেই অন্যায্য সুবিধা পেয়ে আসছেন। প্রস্তুতিহীনতার চরম ঝুঁকি নিয়ে মেলায় এসে আমরা এমন বৈষম্যের শিকার হবো, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তাই শুধুমাত্র এবারের মেলার এই অস্বাভাবিক ও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনাতেই আমরা সমস্ত প্যাভিলিয়ন সাময়িকভাবে বাতিল করার যৌক্তিক দাবি জানিয়েছিলাম। মাননীয় মন্ত্রীদ্বয়ের সামনেই বাংলা একাডেমির ডিজি মহোদয় এই দাবিটিকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য বলে আমাদের মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, মিটিং-পরবর্তী বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবির কথা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়।
এরপর বাংলা একাডেমির ডিজি ও সচিব মহোদয়কে এ বিষয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দিলে তারা আমাদের প্রতিনিয়ত আশ্বস্ত করেন যে, এই দাবি বাস্তবায়ন করা হবে। এমনকি গত ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়ও ডিজি মহোদয় আমাদের দাবি খুবই ন্যায্য বলে স্বীকার করেন (যার ভিডিও রেকর্ড আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে)।
কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না দেখে, এই অস্বচ্ছতা নিরসনে প্যাভিলিয়ন বাতিলের জন্য আমরা গত ২০ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) রাত ১০টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে মহাপরিচালক মহোদয়কে আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) সারাদিন আমরা কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক পদক্ষেপের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আজ সন্ধ্যার দিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব মহোদয় ফোনে আমাদের জানান যে, প্যাভিলিয়ন বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না এবং তিনি এবারের মতো প্যাভিলিয়ন রেখেই আমাদের মেলায় আসার অনুরোধ করেন।
সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো, প্যাভিলিয়ন বাতিল করতে না পারার কারণে বাংলা একাডেমি আজ পর্যন্ত স্টল নম্বর বরাদ্দের লটারিও করতে পারেনি। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, আর মেলা শুরু হবে ২৫ তারিখে। লটারি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত কেউ স্টলের জায়গাই বুঝে পাননি। এমন একটি চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে, উদ্বোধনের মাত্র ৩ দিন আগে খালি মাঠে স্টল নির্মাণ করে, বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে এবং বই গুছিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করা কারিগরি ও বাস্তবিকভাবে কোনো প্রকাশকের পক্ষেই আর সম্ভব নয়।
তাই বাধ্য হয়েই, বাস্তবতার নিরিখে ‘প্রকাশক ঐক্য’ এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ থেকে নিজেদের বিরত রাখছে। ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর বড় প্রকাশকরা মেলায় অংশ নিতে পারছেন না বলে সর্বস্তরের সাধারণ প্রকাশকরাও মেলায় অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন।
তবে আমরা বারবার আমাদের সদস্যদের বলেছি যে, কেউ যদি তার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অবস্থান থেকে মেলায় অংশগ্রহণ করতে চান, তবে তাতে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।
আমরা কোনোভাবেই মেলার বা সরকারের প্রতিপক্ষ নই। আমরা চাই একুশের বইমেলা তার আপন মহিমায় উদযাপিত হোক। নবনির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান প্রথমবারের মতো এই বইমেলার উদ্বোধন করবেন, আমরা তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই এবং এবারের বইমেলার সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।
ধন্যবাদান্তে,
প্রকাশক ঐক্য-এর পক্ষে
সাড়ে তিনশত প্রকাশবৃন্দ












