বাংলাদেশে চা বাগান শ্রমিকরাই সব থেকে বেশি শোষিত ও নির্যাতিত। একশ’-দেড়শ’ বছর আগে এই চা বাগানগুলোর ব্রিটিশ মালিকরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরিবদের নিয়ে এসে শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগায়। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের কিছু জায়গা থেকে আসা এই শ্রমিকরা তামিল, তেলেগু, উড়িয়া, সাঁওতাল ও হিন্দিভাষী। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা উত্তর-পূর্ব ভারতের চা বাগানগুলোতেও একইভাবে শ্রমিক আমদানি করা হয়।
প্রথম থেকেই এই গরিবদের এমন মজুরি দেয়া হয় যা সুস্থ শরীরে সপরিবারে জীবনযাপন করার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। তারা অসম্ভব নিুমজুরিতে কাজ করতে থাকেন। নিুমজুরি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের কোনো আন্দোলন ও প্রতিরোধ ছিল না। বিশ শতকের তিরিশ-চল্লিশ দশকে চা বাগান শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট প্রভাবিত চা বাগান শ্রমিকদের ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। মজুরি বৃদ্ধি, রেশন ইত্যাদির জন্য এই ইউনিয়নগুলো কিছু আন্দোলন করলেও তাদের আন্দোলন কোনো সময়ই তেমন জোরদার ছিল না। কাজেই কোনো কোনো বাগানে ট্রেড ইউনিয়ন সক্রিয় থাকলেও আন্দোলনের মাধ্যমে মজুরি বৃদ্ধি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্যভাবে হয়নি। এছাড়া ছিল নারী শ্রমিকদের ওপর বিশেষ নির্যাতন। চা বাগান কর্তৃপক্ষ এবং তাদের কর্মচারীরাই এভাবে নারী নির্যাতন করত। আন্দোলনের মাধ্যমে তা কিছু কমে এলেও এদিক দিয়ে দীর্ঘদিন পরিস্থিতি অপরিবর্তিত ছিল। এখন নারী নির্যাতন আগের মতো না থাকলেও মজুরিসহ সাধারণভাবে কাজের অবস্থা এখনও পর্যন্ত এমন পর্যায়ে আছে যে এই শ্রমিকদের জীবনযাপনকে মানবেতর ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না।
গত শতাব্দীর চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে সিলেটের চা বাগানগুলোতে যে শ্রমিক সংগঠনগুলো ছিল তার কোনো অস্তিত্ব বা কার্যক্রম এখন নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে চা শ্রমিকদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন না ঘটায় তা আগের মতোই রয়ে গেছে। সম্প্রতি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকায় চা বাগান শ্রমিকরা এক আন্দোলন শুরু করেছেন। কিন্তু এ আন্দোলনের সঙ্গে তাদের মজুরি বৃদ্ধি, অন্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। বস্তুতপক্ষে এ আন্দোলন চা বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে নয়। আন্দোলন শুরু হয়েছে সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এর কারণ, চুনারুঘাটের চাঁদপুর বেগমখান চা বাগানের শ্রমিকরা শতাধিক বছর ধরে বাগান সংলগ্ন যে ৫১১ একর জমি চাষ করে নিজেদের কিছু অতিরিক্ত আয়ের সংস্থান করে এসেছেন, সে জমি Special Economic Zone (SEZ) বা বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা গঠনের জন্য সরকার কর্তৃক দখল নেয়ার সিদ্ধান্ত। এই জমি সরকারের থেকে ইজারা নিয়েছিল চা বাগান কোম্পানি ডানকান, যা আসলে ছিল তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত। কাজেই সেখানে কিছু না করে ডানকান কোম্পানি তা ফেলে রেখেছিল। এই ফেলে রাখা জমিতে চাঁদপুর বেগমখান চা বাগানের শ্রমিকরা একশ’ বছর ধরে চাষাবাদ করে আসছেন। চা বাগান কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কোনো আপত্তি করেনি। তার কারণ, এভাবে চাষাবাদ করায় শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির তাগিদ কম হবে।
এই চা বাগান শ্রমিকরা সাধারণভাবে নিজেদের চা জনগোষ্ঠী বললেও এদের মধ্যে আছেন সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডাসহ অন্যান্য জাতির লোক। তারা বাংলা জানলেও নিজেদের মধ্যে কথা বলেন তাদের নিজস্ব ভাষায়। তারা দীর্ঘদিন ধরে ডানকান মালিকানাধীন ৫১১ একর জমিতে চাষাবাদ করে যে ফসল উৎপাদন করেন, তার মাধ্যমে তাদের আয়ের কিছু সংস্থান হয়। এই জমি কোনো কাজে না লাগিয়ে ফেলে রাখার কারণ দেখিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসন অর্থাৎ ডিসির অফিস ডানকানের ইজারা বাতিল করে এ জায়গায় এসইজেড করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর ফলে চা বাগান শ্রমিকরা আর এই জমি আবাদ করতে পারবেন না এবং তারা স্বল্প মজুরির ঘাটতি পূরণের জন্য যে সামান্য আয় এই জমি থেকে করতেন, সেটা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। এ অবস্থা যে তাদের অর্থনৈতিক জীবনে এক বড় রকম সংকট তৈরি করবে এতে সন্দেহ নেই।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চাঁদপুর বেগমখান চা বাগানে কাজ করেন ১৬ হাজার শ্রমিক। সরকারি কর্তৃপক্ষ ‘বাংলাদেশ ইকোনমিক অথরিটি’ নামক সংস্থার সঙ্গে এক চুক্তি করেছে এসইজেড করার জন্য। এর বিরুদ্ধে সেখানকার শ্রমিকরা এখন আন্দোলন করছেন। কারণ তাদের মজুরি ভয়াবহভাবে কম, সপ্তাহে মাত্র ৬৯ টাকা অর্থাৎ মাসে দু’হাজার টাকার সামান্য বেশি! এছাড়া তাদের রেশনে গম দেয়া হয় মাথাপিছু সাড়ে তিন কেজি আটা। এই মজুরি বর্তমান বাংলাদেশের বাজারদর অনুযায়ী যে টিকে থাকার মতোও নয়, এটা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া শ্রমিকদের চিকিৎসা, তাদের সন্তানদের শিক্ষা ইত্যাদির কোনো ব্যবস্থাই সেখানে নেই।
এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা যে জমির ওপর নিজেদের চাষাবাদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলনে নামবেন এটাই স্বাভাবিক। কাজেই তারা জমি বেদখল হওয়ার বিরুদ্ধে এখন আন্দোলন করছেন। শুধু পুরুষরাই নয়, নারী শ্রমিকরাও এই আন্দোলনে বড় আকারে অংশগ্রহণ করছেন। জমির ওপর অবস্থান নিয়ে তীর-ধনুক, লাঠি-সড়কি ইত্যাদি নিয়ে তারা প্রতিরোধে নেমেছেন। তাদের জমি থেকে হটানোর জন্য সরকারদলীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকজন সশস্ত্রভাবে শ্রমিকদের আক্রমণ করতে এলে শ্রমিকরাও তাদের ধাওয়া করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু হাজার হলেও তারা সরকারি লোক। কাজেই তারা জমি থেকে শ্রমিকদের হটিয়ে দেয়ার জন্য সব রকম চক্রান্ত করছে। এখন প্রতিদিনই এলাকার শ্রমিকরা সভা করছেন যাতে উপস্থিত থাকছেন হাজার হাজার শ্রমিক।
শ্রমিকদের এই আন্দোলনে চা বাগান মালিক ডানকানের কোনো বিরোধিতা নেই, উপরন্তু তারা নীরবে এই আন্দোলন সমর্থন করছে। কারণ শ্রমিকরা এভাবে জমিতে চাষাবাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে তারা মালিকদের বিরুদ্ধে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের দিকে যাবেন। এটা মোটেই তাদের কাম্য নয়। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি লক্ষ করার মতো তা হল, জমির ওপর চাষের অধিকার রক্ষার জন্য শ্রমিকরা আন্দোলন করলেও মজুরি বৃদ্ধির কোনো আন্দোলন তাদের মধ্যে নেই। অথচ প্রতিদিন প্রত্যেক শ্রমিককে অন্তত ২৩ কেজি চা পাতা বাধ্যতামূলকভাবে সংগ্রহ করে জমা দিতে হয়। প্রতি কেজি চা মালিকরা বাজারে বিক্রি করে ১৫০ টাকা দরে! এর থেকেই বোঝা যায় শ্রমিকদের শ্রমশক্তি শোষণ করে মালিকরা কী বিপুল পরিমাণ মুনাফা করে।
শ্রমিকরা জমিতে চাষের অধিকার রক্ষার জন্য যে আন্দোলন করছেন সেটা ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির জন্য আন্দোলনই হওয়া দরকার শ্রমিকদের আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শ্রমিকরা জমিতে চাষ করেন কম মজুরির ঘাটতি পূরণ করার জন্য। এটা তাদের জন্য কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এটা তাদের করতে হচ্ছে মজুরি জঘন্যভাবে অল্প থাকার জন্য। মজুরি বৃদ্ধি ও সেই সঙ্গে চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষার জন্য আন্দোলনই শ্রমিকদের মূল শ্রেণীগত আন্দোলন। কাজেই জমি রক্ষার জন্য এখন যে আন্দোলন হচ্ছে তার সঙ্গে সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধিসহ অন্যান্য অধিকারের জন্য আন্দোলন তাদের করতেই হবে। কিন্তু এই আন্দোলনে যারা সহায়তা করতে এগিয়ে আসছেন, এনজিওসহ এসব সংগঠনের কোনো দৃষ্টি সেদিকে নেই। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া দরকার। এজন্য এখন শ্রমিকদের নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের প্রয়োজন খুব বেশি। কারণ বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশে ১০০ নতুন এসইজেড করার। কাজেই ক্ষমতার জোরে পুলিশ ও নিজেদের ভাড়া করা লোক দিয়ে তারা শ্রমিকদের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ চালিয়ে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে এবং এ চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত তাদের সাফল্য শুধু সময়ের ব্যাপার। কাজেই জমি রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে তারা যদি মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন না করেন, তাহলে তাদের অবস্থা আরও দুর্বিষহ হবে। এ কারণে যারা শ্রমিকদের জমি রক্ষা আন্দোলনে সহায়তা করছেন, তারা যদি শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলনের ক্ষেত্রে নীরব থাকেন অথবা নানা কৌশলে তাদের সে চেষ্টা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন, তাহলে তারা শ্রমিকদের লাভের থেকে ক্ষতির পাল্লাই ভারি করবেন।
বদরুদ্দীন উমর













