নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান গতকাল শনিবার গণমাধ্যমকে এ কথা বলেছেন। তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপিকে আলোচনায় ডাকা হয়েছে বিদেশিদের চাপে। গতকাল রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত আলোচনাসভায় তিনি এ কথা বলেন।
গত বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বিএনপিকে চিঠি দিয়ে আলোচনার আহবান জানিয়ে এ ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন বলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ক্ষমতাসীন দল একে দেখছে নির্বাচন কমিশনের শিষ্টাচার হিসেবে। নির্বাচন ‘যথেষ্ট অংশগ্রহণমূলক’ হবে নিশ্চিত হলে পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।আগামী নভেম্বরের দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তার আগে আগামী মে থেকে জুন মাসের মধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করতে হবে কমিশনকে। সময় যত কমে আসছে, এসব নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি না তা নিয়ে ভাবনাও বাড়ছে নির্বাচন কমিশনের।
নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান বলেছেন, বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে হয়নি। কমিশন সার্বিকভাবে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও বিএনপিকে একাধিকবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের কথা অনুধাবন করে আলোচনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে।
আওয়ামী লীগ দেখছে শিষ্টাচার হিসেবে : ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বিএনপিকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টিকে নির্বাচন কমিশনের শিষ্টাচার হিসেবে দেখছে। দলটির সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো নির্বাচন কমিশনের শিষ্ঠাচার। তাদের কাজ রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত পর্যালোচনা করে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ প্রস্তুত করা। নির্বাচন কমিশন তাদের শিষ্ঠাচার প্রদর্শন করেছে। একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তাদের কোন আচার প্রদর্শন করবে, সেটি একান্ত তাদের রুচি ও মননের বিষয়।
উন্নয়ন সহযোগীদের অবস্থান : বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছে। তবে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে কি না তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে।
ইইউ আগামী নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশে ইইউ ডেলিগেশন প্রধান চার্লস হোয়াইটলি সম্প্রতি বলেছিলেন, “নির্বাচন ‘যথেষ্ট অংশগ্রহণমূলক’ এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা (নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে) হলে হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ (ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ জোসেফ বোরেল) নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশকে অগ্রাধিকারের দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।”
ইউরোপীয় ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০০৮ সালে নবম জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন পাঠায়নি। ইইউর তৎকালীন পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ ক্যাথরিন অ্যাশটন বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিলেন, জাতিসংঘের উদ্যোগসহ অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বড় দশগুলো অংশ নিলেও ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন না পাঠিয়ে বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছিল। এর কারণ হিসেবে তখন ইইউ বাজেট ঘাটতি ও অন্য দেশের নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মত : নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হোক—এটা সব নির্বাচন কমিশনেরই প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নেই।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, এই আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের একটি রুটিন কাজ। তবে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করা নিয়ে কমিশন যে ভাবছে, বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছে। কিন্তু কমিশন তো জানে বিএনপির বিরোধিতা তাদের সঙ্গে নয়, সরকারের সঙ্গে।
নির্বাচন নিয়ে ইসির আগের বক্তব্য : গত বছর ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়াল বলেছিলেন, ‘অতীতের অনেক নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা বা তর্ক-বিতর্ক হলেও ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অতিমাত্রায় সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। আমরা নিরপেক্ষ থেকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে সমালোচনা ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে চাই।’
গত ১৮ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলকে সিইসি বলেন, কিছু বিষয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য থাকার কারণে নির্বাচনী পরিবেশটা এখনো অনুকূলে নয়। তবে অচিরেই এই মতপার্থক্যটা দূর হয়ে যাবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদিতে এক অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, নির্বাচনে প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে সে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যাবে না। সে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, বড় কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে ফলাফল নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হবে।













