খাদ্য নিরাপত্তাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
আবদুল লতিফ মণ্ডল
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশে বর্তমানে ১৬ লাখ টন খাদ্য মজুত রয়েছে। খাদ্যের মজুত যাতে কমে না যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ এদিকে ১ ডিসেম্বর জেনেভায় গ্লোবাল হিউম্যানিটারিয়ান ওভারভিউ রিপোর্ট ২০২৩ প্রকাশের সময় জাতিসংঘের শীর্ষ জরুরি ত্রাণ কর্মকর্তা মার্টিন গ্রিফিথ বলেছেন, আগামী বছর তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে বিশ্বের ৫৩ দেশের ২২২ মিলিয়ন, তথা ২২ কোটির বেশি মানুষ।
গত অক্টোবরে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-২০২২’ অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীর ৪৪টি দেশে খাদ্য সংকটের কারণে ক্ষুধার মাত্রা ‘গুরুতর’ বা ‘ভয়ংকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংস্থা-জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রধানরা এক যৌথ সতর্কবার্তায় বলেছেন-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা, খাদ্যের উৎপাদন হ্রাস, পরিবহণব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাসহ নানা কারণে আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট আরও তীব্র হবে।
এর প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে। এতে মানুষের মধ্যে পুষ্টির সংকট আরও প্রকট হবে, যা বিশ্বের একটি অংশকে মহামারির দিকে নিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশ তার বাইরে নয়। এফএওর অন্য একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৪৫টি দেশে ঘাটতিজনিত মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি।
এর মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকা মহাদেশে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানসহ ৯টি এশিয়া মহাদেশে, দুটি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এবং একটি ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত। তাই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সময়োচিত।
জাতিসংঘের বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা কমিটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, খাদ্য নিরাপত্তা তখনই বিরাজমান, যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণের তিনটি নিয়ামক হলো-এক. খাদ্যের প্রাপ্যতা, দুই. খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা, তিন. খাদ্যের পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা।
খাদ্যের প্রাপ্যতা নির্ধারণে ওইসব ফ্যাক্টর মূল্যায়ন করা হয়, যেগুলো খাদ্যের সরবরাহ ও সহজলভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এগুলো হলো-খাবার সরবরাহে প্রাচুর্য, কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয়, কৃষি অবকাঠামো, খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ও খাদ্য অপচয়।
ক্রয়ক্ষমতা পরিমাপে যে ছয়টি অনুসূচক ব্যবহার করা হয় সেগুলো হলো-একটি খানার সার্বিক ব্যয়ে খাবারের ব্যয়ের পরিমাণ, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত, মাথাপিছু জিডিপি, কৃষিপণ্য আমদানিতে ট্যারিফের হার, খাদ্য নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি এবং কৃষকের আর্থিক সহায়তা লাভের সুযোগ। খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তার নির্দেশক বিশ্লেষণ করা হয় খাদ্যের বহুমুখীকরণ, পুষ্টিমান ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের উপস্থিতি, প্রোটিনের মান এবং নিরাপদ খাদ্য দ্বারা।
দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই আসে খাদ্যের সরবরাহ ও সহজলভ্যতার বিষয়টি। খাদ্যের মোটামুটি ১১টি উপাদান থাকলেও দেশে খাদ্য বলতে মূলত চাল থেকে তৈরি ভাতকে বোঝায়। আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য চালের উৎপাদন কৃষি খাতের (শস্য উপখাত, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে কৃষি খাত গঠিত) উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের ৬.৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হার হ্রাস পেয়ে পরবর্তী এক দশকে গড়ে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়ায় (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৯-২০)।
২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ খাতে প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী হারের সরাসরি প্রভাব পড়ে শস্য উপখাতের প্রধান ফসল ও আমাদের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনের ওপর। দেখা দেয় চালের মোট উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি হারে অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও অন্যান্য রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাদ দিলে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার নেতিবাচক থেকে ১.৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
সরকারি তথ্য মোতাবেক, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭ শতাংশ (২০২০ সালে)। অর্থাৎ এ সময়কালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার চাল উৎপাদন প্রবৃদ্ধি হারের চেয়ে বেশি ছিল। ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে দেশে যখন জনসংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, তখন খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এদিকে দীর্ঘ খরা ও ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে চলতি আমন ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা (১ কোটি ৬৩ লাখ টন) অর্জনের সম্ভাবনা নেই বলেই অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন।
আর খাদ্যশস্যের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চললেও পণ্যটির উৎপাদন ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের ১৯ লাখ ৮ হাজার টন থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১১-১২ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গমের এ উৎপাদন দেশের চাহিদার (কম-বেশি ৭০ লাখ টন) ছয়ভাগের একভাগ। অর্থাৎ গমের ক্ষেত্রে দেশ প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।
দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্য চাহিদা মেটাতে না পারায় এগুলোর আমদানি ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। চলতি অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে ১৯ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্য বেড়ে যাওয়া, বিশ্বব্যাপী পরিবহণ ব্যয় অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়া এবং দেশে ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় খাদ্যশস্য আমদানিতে গতি আসেনি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মোতাবেক, চলতি অর্থবছরের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে মাত্র ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৩ টন চাল আমদানি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন স্বল্পতা এবং আমদানিতে শ্লথগতির কারণে সব শ্রেণির চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক বিপুল চাহিদার বিপরীতে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ লাখ ১৪ হাজার ৩৯ টন গম আমদানি হয়েছে। আটার দাম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বাজারে মোটা চালের চেয়ে আটার দাম বেশি হওয়ায় চালের ওপর চাপ বেড়েছে।













