শীতল যুদ্ধের যুগ অতীত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বিরোধের আবহে ৫৭ বছর আগের ‘কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট’-এর স্মৃতি মনে করে দিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়িয়ে তিনি হুমকি দিলেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনী প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র যদি চায়, তাহলে তাদের ফের ওই সংকট দেখতে হবে। পুতিনের দাবি, তাঁর দেশ পরমাণু অস্ত্রের প্রথম অভিঘাতটি দেওয়ার জন্যও তৈরি।
রাশিয়ার ফেডারেল অ্যাসেম্বলিতে সংসদ সদস্য, বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নর ও সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বুধবার দেওয়া ভাষণে পুতিন এ হুঁশিয়ারি দেন। পুতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য করলে মস্কো মার্কিন জলসীমার কাছে জাহাজে কিংবা সাবমেরিনে শব্দের চেয়েও কয়েক গুণ গতিসম্পন্ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
স্নায়ুযুদ্ধকালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে চাপে রাখতে ১৯৬২ সালে তুরস্কে ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে মস্কো যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে হামলার জন্য কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়ে দিয়েছিল। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে দুই মহাশক্তিধর দেশের মধ্যে টানাপড়েনে পরমাণু যুদ্ধ বাধার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিলে দুই সপ্তাহের ওই টানটান উত্তেজনার ‘মিসাইল ক্রাইসিস’-এর অবসান ঘটে। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভকে কেনেডি তুরস্ক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার গোপন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে পরে জানা যায়।
প্রায় ছয় দশক পরে দুই দেশের তিক্ততার আবহে সেই স্মৃতিই মনে করাল মস্কো। রাশিয়ার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ফের ইউরোপে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ করছে। ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস’ (আইএনএফ) চুক্তি নিয়ে টানাপড়েন চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। মস্কো সেই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছে আমেরিকা। ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত ওই ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ)’ চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
পুতিন বলেছেন, আইএনএফ থেকে সরে গিয়ে ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়ার কাছাকাছি ইউরোপের কোথাও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, তাহলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের কাছাকাছি একই ধরনের কিংবা তার চেয়েও দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে।’ তিনি জানান, রুশ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এমন জায়গায় মোতায়েন করা হবে, যেখান থেকে সহজে এবং দ্রুততম সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানা সম্ভব হবে। ‘এগুলো (হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র) স্থির বসে থাকবে না, তারা গতিশীল থাকবে এবং (লক্ষ্যবস্তুকে) খুঁজে নেবে। আপনারা এ নিয়ে কাজ করতে পারেন, এর গতি থাকবে ম্যাচ নাইন (শব্দের থেকেও ৯ গুণ বেশি), আওতা হবে এক হাজার কিলোমিটার”—পুতিন এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।
রুশ প্রেসিডেন্টের এ বক্তব্য সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে পুতিনের আগের এ ধরনের হুঁশিয়ারিগুলোকে ‘প্রপাগান্ডা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল ওয়াশিংটন। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যে আইএনএফ চুক্তি লঙ্ঘন করে আসছে মার্কিন এ অভিযোগকে পাশ কাটাতেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এসব বলতেন বলেও ইঙ্গিত ছিল তাদের।
যুক্তরাষ্ট্র চলতি মাসের প্রথম দিনই ওই চুক্তির কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে। মস্কো আইএনএফের লঙ্ঘন বন্ধ না করলে ছয় মাস পর তা পুরোপুরি বাতিল হবে বলেও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
পুতিন বলেছেন, তিনি কোনো ধরনের ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ চান না, তবে ওয়াশিংটন ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করলে তাঁর হাতে অন্য কোনো বিকল্পও থাকবে না। সূত্র : রয়টার্স।













