কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জমির বিশাল অংশের জৈব উপাদানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে সময়ের ফসল সময়ে উৎপাদন হচ্ছে না।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কৃষির অপরিকল্পিত নিবিড়করণ, পরিকল্পনাহীন শস্য আবর্তন, নানা উচ্চফলনশীল শস্যের চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটিতে জৈব উপাদানের ঘাটতি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্রমতে, লবণাক্ততার কারণে এরই মধ্যে ১৮ জেলার ৯৩ উপজেলার ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমির মাটি কম-বেশি দূষিত হয়ে পড়েছে। জৈব উপাদানের ঘাটতি ধরা পড়েছে ৫২ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে।
মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) অন্য এক সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মাটিতে জৈব সার রিসাইক্লিং হচ্ছে না, বরং ক্ষয় হচ্ছে। জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। এটা গাছের পুষ্টি ধরে রাখে এবং মাটির নিবিড়তাও রক্ষা করে। অজৈব রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে। সরকারি এ সংস্থার হিসাব দেশের ৭ লাখ হেক্টর জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে বলা হলেও একাধিক বেসরকারি সংস্থার হিসাব তা ৫২ লাখ হেক্টরের কম নয়। এ অবস্থায় গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, সবুজ সার, কম্পোস্ট ইত্যাদি সঠিকভাবে পচিয়ে প্রতি শতাংশ জমিতে ১০ থেকে ২০ কেজি করে প্রয়োগ করলে ধীরে ধীরে মাটি উর্বরতা ফিরে পাবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসিরুজ্জামান সভ্যতাকেই মাটির সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করেন। সভ্যতার কারণে মাটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মাটি দূষণের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের ৬ কোটি লোক উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইটভাটা, রাস্তা ও ভবন নির্মাণ এবং পুকুর খননসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ক্রমাগত মাটির ওপরের স্তর নষ্ট হচ্ছে। এ াড়া ভূগর্ভস্থ পানি উঠানোর কারণে সমুদ্রের নোনা পানির সম্প্রসারণ ঘটছে, বাড়ছে লবণাক্ততা। এ কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ চাষাবাদ করতে পারছে না। আঘাত হানছে সিডর, আইলার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও। তিনি বলেন, আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাসের মতো গাছের পরিবর্তে সরকারি রাস্তার পাশে পরিবেশবান্ধব গাছ লাগাতে হবে। জুম চাষ ও মাটি কাটার কারণে পাহাড়ে ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।
সংকট থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মৃত্তিকাবিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, পাহাড়, উপকূল, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা নদীর তলদেশসহ দেশের কোন কোন অঞ্চলের মাটির কী কী সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। মাটিকে প্লাস্টিকের হাত থেকেও রক্ষা করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে চরাঞ্চলে জেগে ওঠা নতুন জমিকে কাজে লাগাতে হবে। ইতোমধ্যে জেগে ওঠা চরের মাটিকে কাজে লাগিয়ে অনেক কৃষক ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। জৈব কৃষির উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় ধৈঞ্চা ও মান্দার গাছ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়াও পরিবেশবান্ধব ভার্মিকম্পোস্টের ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষির উৎপাদন খরচ কমাতে হবে।
মৃত্তিকাবিজ্ঞানীদের মতে, গত এক দশকে দেশের কৃষিজমিতে ৪০ শতাংশ জৈব উপাদান কমে গেছে। ফসল উৎপাদন ঠিক রাখতে মাটির জৈব উপাদান শতকরা সাড়ে ৩ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও দেশের ৭ লাখ হেক্টর জমির মাটিতে এ উপাদান ১ শতাংশের নিচে। প্রায় ৪০ লাখ হেক্টর জমির এ উপাদান ২ শতাংশের নিচে। ফলে মাটি উর্বর রাখতে যে অণুজীব কাজ করে, তা ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে জৈব সারের গুণগত মান ঠিক রেখে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। সেই সঙ্গে তদারকি ব্যবস্থা জোরদারে জৈব সারের গুণগতমান নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কৃষির অপরিকল্পিত নিবিড়করণের ফলে প্রচলিত শস্য আবর্তনগুলো যেমন, ধান-শিম-ধান, ধান-ডাল-ধান ইত্যাদি ভেঙে পড়াই মূলত মাটিতে জৈব উপাদানসহ নানা পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি করছে। তা ছাড়া উচ্চফলনশীল জাতের শস্যের আবাদ বেড়ে যাওয়াকেও অন্যতম কারণ হিসেবে শনাক্ত করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ জৈব সার জমির উন্নত মাটির গঠন নিশ্চিত করে, মাটিতে বায়ু চলাচলের পরিমাণ বাড়ায়, পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি ও সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখে। জৈব সার বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উচিত, কৃষক পর্যায়ে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করা।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের জরিপে দেশের শতকরা ২৫ ভাগ জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। ১৯৯৮ সালের পর থেকে ১২ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কমেছে। এসআরডিআইর বিজ্ঞানীদের মতে, এক দশক ধরে মাটিতে জৈব উপাদান ছাড়াও ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরন ও অন্যান্য উপাদানের পরিমাণ বিপজ্জনক হারে কমে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর বোরন ও জিংক ঘাটতির জমি বেড়েছে শতকরা ৪০ ও ১৮ ভাগ। উপরন্তু সালফার, পটাশিয়াম ও ফসফরাস ঘাটতির জমি বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা ৫০, ৪৫ ও ১৭ ভাগ। দেশে সারের ব্যবহার বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিলে এ ঘাটতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে কৃষিজমি না বেড়ে বরং ১ শতাংশ হারে কমতে থাকলেও নানা রকম রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে দ্বিগুণ। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের মতে, গত এক দশকে দেশের কৃষিজমিতে ৪০ শতাংশ জৈব উপাদান কমেছে। ফসল উৎপাদন ঠিক রাখতে মাটির জৈব উপাদান শতকরা সাড়ে ৩ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের জমিতে এ উপাদান এক বা এর নিচে। মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষির অপরিকল্পিত নিবিড়করণের ফলে প্রচলিত শস্য আবর্তনগুলো ভেঙে পড়া মাটিতে জৈব উপাদানসহ নানা পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির অন্যতম কারণ। তা ছাড়া উচ্চফলনশীল জাতের শস্যের আবাদ বেড়ে যাওয়াকেও অন্যতম কারণ হিসেবে শনাক্ত করেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, আগে দুবার ধান চাষের মাঝখানে শিম বা নানা জাতের ডাল চাষ করা হতো। কারণ প্রাকৃতিক উপায়েই শিম বা ডাল ফসল মাটিতে জৈব উপাদান যোগ করে। অর্থাৎ ধান চাষে যা ঘাটতি হয়, এ ফসলগুলো তা পুষিয়ে দেয় মাটিকে। অন্যদিকে উফশী ফসলের উৎপাদন বেশি হলেও, চিন্তার বিষয় যে তা মাটি থেকে প্রচুর পুষ্টি উপাদান টেনে নেয়। অন্যদিকে, মাটিতে গাছের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় যে পুষ্টি উপাদান গাছ কর্তৃক অপসারিত হয়, সেই হারে মাটিতে যোগ হয় না। আমাদের দেশের কৃষকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর সার প্রয়োগ করে থাকেন। ফলে দিন দিন মাটির স্বাস্থ্য বা উর্বরা শক্তি কমে যাচ্ছে।
মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) পরিচালক বিধান কুমার ভা-ার আমাদের সময়কে জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের বিরূপ প্রভাবে মাটি যে স্বাস্থ্য হারাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আমরা এ জন্য চিন্তিত নই। লবণসহিষ্ণু জাতের ফসল উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছে। বোরোর উৎপাদন দক্ষিণবঙ্গে নেওয়ার কাজ চলছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটির জন্য তরমুজ, বাঙ্গি, করলা, ঝিঙ্গা ইত্যাদি চাষে কৃষককে উৎসাহিত করা হচ্ছে।













