রাস্তায় অনেক অসহায় মানুষ থাকেন, যাদের গায়ে ময়লা, পোশাক নোংরা, চুল-দাড়ি-নখ বড় আর শরীর থেকে গন্ধ আসে। তাই অনেকেই তাদের এড়িয়ে চলেন। এমন মানুষদের ধরে গোসল করানো, চুল-নখ কেটে পরিষ্কার করে নতুন পোশাক পরিয়ে দেওয়ার মানবিক উদ্যোগগুলো আমাদের সমাজে বহু আগে থেকেই প্রশংসিত।
বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের দেশেও অসংখ্য তরুণ এবং স্বেচ্ছাসেবী দল এই মহৎ কাজে এগিয়ে এসেছেন।
এই ধরনের পরিবর্তনের ভিডিওগুলো মুহূর্তেই ভাইরাল হয়, আর তা দেখে অনেকেই সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। নিঃসন্দেহে এটি মানবসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ভিডিওতে চোখ আটকে যাচ্ছে, যা এই পুরো উদ্যোগের পবিত্রতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মানুষের সেবার নামে কিছু ক্ষেত্রে যে ভাষা ও ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা কেবল উগ্র নয়, অনেক সময় তা জোর-জবরদস্তির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
সমাজের চোখে যারা ‘পাগল’ বা ‘অপরিচ্ছন্ন’, তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় কোনো খাদ নেই। পোকামাকড় বা মশা-মাছির উপদ্রব থেকে তাদের মুক্তি দেওয়াটা নিঃসন্দেহে বড় কাজ।
তবে মূল সমস্যাটি শুরু হয় যখন এই সেবার লক্ষ্যবস্তু হয় বাউল, ফকির বা পীর-দরবেশের মতো ঐতিহ্যবাহী পথের মানুষেরা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একজন বাউল-ফকিরের জটাচুল জোরপূর্বক কেটে দেওয়া হচ্ছে।
বাউল, ফকির বা নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক পথের মানুষদের কাছে তাদের জটা, গেরুয়া বস্ত্র বা বিশেষ বেশভূষা কেবল বাহ্যিক সাজ নয়—এটি তাদের দর্শন, বিশ্বাস এবং আত্মপরিচয়ের অংশ। তাদের বেশভূষা হয়তো সমাজের মূলধারার দৃষ্টিতে ‘ছেঁড়া’ বা ‘নোংরা’ হতে পারে, কিন্তু সেই ছেঁড়া বস্ত্র বা লম্বা চুল তাদের কাছে ত্যাগের প্রতীক, সাধনার চিহ্ন।
যখন এই সেবাকারীরা, ভালো উদ্দেশ্য নিয়েও, কোনো বাউলকে জোর করে ধরে তার বছরের পর বছর ধরে রাখা জটা কেটে দেন বা পীরের ছেঁড়া গেরুয়া বস্ত্র ছিঁড়ে ফেলে নতুন পোশাক পরিয়ে দেন, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটি কি সত্যিই মানবসেবা, নাকি ব্যক্তির ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ?
মনে রাখতে হবে, মানবসেবা কখনো একতরফা হতে পারে না। ‘পাগল’ বা মানসিকভাবে অসুস্থদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার অংশ হিসেবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এক বিষয়, আর নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্য বহন করা মানুষকে তার ব্যক্তিগত পছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে পরিবর্তন করে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সেবার আড়ালে যদি কারো বিশ্বাস বা জীবনযাপনের পদ্ধতিকে ‘উগ্র’ ভাষা ও আচরণে অবজ্ঞা করা হয়, তবে তা মানুষের প্রতি সম্মান দেখায় না।
মানবিকতা মানে হলো সম্মান ও সহানুভূতি দিয়ে কাউকে সাহায্য করা। যারা সত্যি সেবাকর্মী, তারা শুধু মানুষের কষ্টটাই দেখেন না, তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সংস্কৃতি বা সাজ-পোশাককেও সম্মান করেন। কাউকে জোর করে ‘স্বাভাবিক’ বানানোর জন্য তার জটা চুল কেটে দেওয়া বা পোশাক ছিঁড়ে ফেলা ঠিক নয়। বরং তাদের কাছে গিয়ে, তাদের অনুমতি নিয়ে সাহায্য করাই হলো আসল সেবা।
সেবার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে বিপদ থেকে ‘উদ্ধার’ করা, তাদের জীবনধারাকে ‘বদলে দেওয়া’ নয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর উচিত তাদের কর্মীদের ব্যবহার ও ভাষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া, যাতে সেবার মহৎ উদ্দেশ্যটি কোনোভাবেই উগ্রতা, অহংকার বা খারাপ ব্যবহারে নষ্ট না হয়ে যায়।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)













