নাগরিক সেবা সহজীকরণ ও প্রশাসনিক উদ্ভাবনের আড়ালে পরিচালিত এই প্রকল্প পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক বয়ান তৈরির হাতিয়ারে। এটি ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম। বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণহীন টুলস। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দুর্নীতি উদঘাটনে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ৪৭২ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রের ১৩টি অধ্যায়ে আইসিটি অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, এটুআইসহ রাষ্ট্রীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেশন ও আর্থিক লুটপাটের দলিলভিত্তিক তথ্য উঠে আসে।
শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, এটুআই উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রূপ নেয় আওয়ামী বয়ান তৈরিতে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারকারী ‘সুপার ইউনিট’-এ। যার কর্মকাণ্ড ও আর্থিক ব্যয় দীর্ঘ সময় ধরে ছিল নজরদারির বাইরে। প্রকল্পের বড় একটি অংশ সরাসরি প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা ও আওয়ামী ভাবমূর্তি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’, ‘উদ্ভাবনী সরকার’, ‘স্মার্ট সিটিজেন’—এ ধরনের চমকপ্রদ স্লোগানভিত্তিক প্রচারে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করা হলেও এসব কার্যক্রমের বাস্তব ফল বা নাগরিক উপকারিতার নির্ভরযোগ্য পরিমাপ পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একাধিক ক্ষেত্রে একই ধরনের কনসেপ্ট বারবার উপস্থাপন করে ভিন্ন ভিন্ন নামে কর্মশালা, সম্মেলন ও কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল লোক দেখানো ও সরকারদলীয় রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি।
শ্বেতপত্রে এটুআই প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো ‘অস্বচ্ছ ও ফলাফলবিমুখ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কোন কার্যক্রমে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেই ব্যয়ের বিপরীতে নাগরিক সেবা কতটা উন্নত হয়েছে— এমন স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি কোথাও। অনেক ক্ষেত্রে সফটওয়্যার, গবেষণা, পরামর্শক নিয়োগ ও কনটেন্ট ডেভেলপমেন্টে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও সেগুলোর স্থায়িত্ব ও পুনঃব্যবহারযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শ্বেতপত্র বলছে, কিছু ডিজিটাল টুল ও প্ল্যাটফর্ম প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আর ব্যবহার হয়নি। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতির প্রতিবেদন যাচাইয়ের পাশাপাশি সরকারি নথি, প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফারাক বিশ্লেষণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই শ্বেতপত্রে। শুধু অভিযোগের তালিকা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও জবাবদিহিহীনতার একটি প্রামাণ্য দলিল।
ডিজিটাল রূপান্তরের নামে সরাসরি আওয়ামী রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে মর্মে শ্বেতপত্রে তথ্য উঠে এসেছে। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন ও সিআরআইয়ের মাধ্যমে ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। একইভাবে ‘খোকা’ সিনেমা নির্মাণের নামে নেওয়া হয় ১৬ কোটি টাকা। এসব ব্যয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোনো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করছে কিনা, নাকি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার হয়েছে আওয়ামী রাজনৈতিক ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার হিসাবে-তা বড় প্রশ্ন হিসাবে থাকল।













