বছরের বাকি সময় যখন সিনেমা হলে সুনশান নীরবতা, তখন ঈদ এলে হঠাৎ প্রাণ ফিরে পায় ঢালিউড। মুক্তি পায় নানা আলোচনায় মুখর কিংবা জমে থাকা সিনেমা, প্রেক্ষাগৃহে জমে দর্শকের ভিড় এবং আশাবাদী হয়ে ওঠেন হল মালিক থেকে শুরু করে নির্মাতা-প্রযোজকরা। এই দৃশ্যপটই যেন বারবারই প্রমাণ করে দিচ্ছে—ঢালিউড এখন শুধুই ‘ঈদনির্ভর’ ইন্ডাস্ট্রি।
ঈদে মুক্তি মানেই ‘সিনেমা বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা’
ঈদের সময়ে দর্শক বেশি পাবার লক্ষ্যেই নায়ক থেকে শুরু করে পরিচালক-প্রযোজক সবাই চান ঈদ ব্যবসায় শামিল হতে। চলতি বছরের হিসেব করলে এই ছয় মাসে এখন পর্যন্ত সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ২৩টি, কিন্তু এর মধ্যে ব্যবসা করতে পেরেছে মাত্র ৪-৫টি সিনেমা; তা-ও আবার সেগুলো ঈদের সিনেমা।
ঈদের বাইরে এ বছরে ব্যবসাসফল তো দূরে, সিনেমা-ই নেই বললে চলে। মাল্টিপ্লেক্সগুলো বিদেশি সিনেমা দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চললেও বছরের অন্যান্য সময়ে সিঙ্গেল হলগুলো প্রায় বন্ধই থাকে।
হল মালিকরা বলছেন, ঈদ ছাড়া ছবিই আসছে না।সবাই একসঙ্গে ঈদে অনেকগুলো ছবি নিয়ে লড়াই করেন, কিন্তু এর বাইরে ছবি মুক্তি দিতে চান না। শুধু ঈদ দিয়ে তো ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। দুই মাস ছবি চললে বাকি ১০ মাস ফাঁকা থাকে।
স্টার সিনেপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘এখানে সময়ের তো কোনো দোষ নেই।আমরা তো সারা বছরই ছবি চালাতে চাই, কিন্তু ছবি-ই নেই। সবাই শুধু ঈদে ছবি রিলিজ দিতে চায়, এর বাইরে অন্য সময়ে কেন দিতে চায় না সেটা তারা ভালো জানেন। পরিচালক-প্রযোজক কিংবা নায়কদের বছরের অন্যান্য সময়ে সিনেমা নিয়ে আসা উচিত।’
এদিকে সিঙ্গেল স্ক্রিন, মধুমিতা হলের মালিক ও সাবেক হল মালিক সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, “শুধু দুই ঈদে একটু ভালো যায়, এরপর সারা বছর হল বন্ধ রাখতে হয়। ঈদে ‘তাণ্ডব’, এরপর ‘উৎসব’ চালালাম; এখন হল বন্ধ।কারণ নতুন ছবি নেই, দর্শকও নেই। ঈদের বাইরে ভালো ছবি না এলে বাকি ১০ মাস কিভাবে চলবে? আমাদের কথা তো কেউ চিন্তা করে না। সবাই ঈদে ছবি মুক্তি দিতে কামড়াকামড়ি করে, অন্য সময় দিতেই চায় না।”
কেন ঈদের বাইরে ছবি চলছে না?
ঈদ নির্ভরতা বাড়ায় কেউ ঈদের বাইরে ছবি মুক্তি চাইছেন না। আবার কেউ বলছেন, ভালো গল্পের নির্মাণ হলে যে কোনো সময়েই তা দর্শক টানতে পারে, এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে। আবার এও প্রশ্ন উঠছে, বড় তারকারা কি ঈদের বাইরে ছবি মুক্তি দিতে ভয় পাচ্ছেন?
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, সারা বছর গাল-গল্পে মেতে থাকে ইন্ডাস্ট্রি, আবার কেউ বা পদবী কিংবা তকমা নিয়ে আলোচনায় থাকতেই পছন্দ করেন। ঈদের বাইরে ছবি মুক্তি দিলে চলবে না, এমন ভীতিও রয়েছে সেসব তারকার মধ্যে; এমন কোথাও শোনা যায়।
তারকারা এখন শুধু ‘ঈদমুখী’
ঢাকাই সিনেমাতে তারকা যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে শাকিব খান থেকে শুরু করে আফরান নিশো, সিয়াম আহমেদ, শবনম বুবলী, পূজা চেরী—সবাই নিজেদের ছবিগুলো ঈদে মুক্তি দিতেই আগ্রহী। কারণ, ঈদের দর্শক মানেই প্রাথমিক সাফল্যের নিশ্চয়তা। এর বাইরে অন্যান্য অনেক তারকার সিনেমা মুক্তি পেলেও সেভাবে ঈদের বাইরে আলোর মুখ দেখে না বললেই হয়। যার কারণে তারা ঈদের বাইরে সিনেমা মুক্তি দিতে সাহস করেন না, সেটা ঢালিউডের সবচেয়ে বড় তারকা শাকিব খানও।
তবে গেল এক দশকে একাধিক হিট সিনেমার রিলিজ ক্যালেন্ডার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘আয়নাবাজি’ থেকে শুরু করে ‘হাওয়া’, ‘দেবী’সহ বেশির ভাগই ঈদের বাইরে মুক্তি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতির দায় কার?
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদ ছাড়া নিয়মিত সিনেমা মুক্তি না দেওয়া অন্যতম কারণ। এর জন্য কেউ কেউ বলেছেন, বড় প্রযোজক-পরিচালক কিংবা তারকারা ঈদের বাইরে বড় বাজেটের সিনেমা নিয়ে আসছেন না। এ ছাড়া ভালো মার্কেটিং কিংবা প্রচার-প্রচারণা না করা, সিনেমা হলের দুরবস্থা এবং একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের মানে বৈচিত্র্যের অভাবকেই এমন পরিস্থিতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
কী হতে পারে সমাধান?
নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার ধরে নিয়মিত সিনেমা রিলিজ, বছরজুড়ে প্রমোশনাল স্ট্র্যাটেজি, তারকাদের ঈদের বাইরে সিনেমা মুক্তির চর্চা ও গল্পে বৈচিত্র্য—পদক্ষেপগুলো নিলে ঈদনির্ভরতাকে ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব—বলে মনে করেন চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ও নির্মাতা মতিন রহমান বলেন, ‘ঈদের ছবিগুলো বড় আয়োজনে, বড় বাজেটে হয়। এটা সব সময়ই, আমাদের সময়েও ছিল। এই সময়টাতে সবাই ফেস্টিভ মুডে ছবি দেখে, বড় প্রযোজক-পরিচালকরাও সেটাকে মাথায় রেখে সিনেমা বানান। সেসব ছবিগুলো চার থেকে ছয় সপ্তাহ চলে, এরপর আর চলে না। ৫২ সপ্তাহর মধ্যে মাত্র ছয় সপ্তাহ ছবি চললে আর বাকি এতগুলো সপ্তাহ দর্শক নেই। আর দর্শক না থাকার কারণেই ওই সময়গুলোতে বড় বাজেটের ছবিগুলো রিলিজ করতে চায় না তারা।’
এখন এই সমস্যা কাটিয়ে উঠাটা খুব কঠিন। আগের মতো সারা বছর ছবি চলতে হলে অনেক শিল্পী লাগবে, অনেক পরিচালক লাগবে, ভালো ছবি লাগবে এবং অনেক হলও লাগবে। শুধু দুই ঈদ দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। এতে করে যারা লগ্নি করছে তাদের দু-চারজনের পুঁজি ফেরত আসছে, এ ছাড়া আর কিছুই না। এই সাময়িক পুঁজি ফেরতের কারণে অন্যান্য আরো যারা বিনিয়োগ করতে চান তারাও সেটা করতে পারছেন না।’
মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের ভাষ্যে, ‘সবাই যদি ভাবে ঈদের বাইরে ছবি মুক্তি দিলে দর্শক আসে না, তাদের ক্ষেত্রে বলব, বছরের অন্যান্য সময়ে আমরা বাংলা ছবি না পেয়ে বিদেশি ছবি চালাই। সেসব ছবি দেখতে দর্শক আসছে। ছবি না পেলে দর্শক আসবে কিভাবে! প্রতি মাসে ছবি মুক্তি পেলে দর্শকেরাও আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে তারা এই মাসে এই ছবি দেখবে। নয়তো দুই মাস ছবি নিয়ে আগ্রহ থাকে তাদের বাকি সময় তারা ভুলেই যায়। আরেকটা কারণ, সব ভালো সিনেমাগুলো সবাই ঈদেই মুক্তি দিতে চায়। এটা থেকেও বেরিয়ে আসা উচিত, ঈদের বাইরে ভালো সিনেমাগুলো মুক্তি দিলে দর্শক আসবেই।’
পরিচালক রায়হান রাফী বিশ্বাস করেন ঈদের বাইরে ভালো বাজেটের কিংবা ভালো গল্পের সিনেমা নিয়ে এলে দর্শক অন্যান্য সময়েও ফিরবে। তিনি বলেন, ‘দুই ঈদ দিয়ে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব না। অনেক দিন ধরে যেহেতু ঈদ ছাড়া ছবি চলছে না, মানুষের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। এটাকে ভাঙতে হবে। অভ্যাসটা এখনো তৈরি হয়নি, তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। হল মালিকরাও আমাদেরকে বলছেন ঈদ ছাড়া ছবি বানাতে। আমি নিজেও চাচ্ছি এবং শাকিব ভাইও চাচ্ছে ঈদ ছাড়াই আসতে।’
ঈদের সিনেমা সফল মানেই ইন্ডাস্ট্রি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এমনটা নয়। বরং এর অর্থ, ঢালিউড এখনো বারো মাসের দর্শকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে ব্যর্থ। ঢালিউডকে টিকিয়ে রাখতে হলে ঈদের বাইরেও দর্শক টানার মতো গল্প প্রয়োজন।













