ইসলাম এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনযাত্রাকে সুস্থ, পরিশুদ্ধ ও সফলতামণ্ডিত করতে সাহায্য করে। ইসলাম মানুষকে পরিশ্রম করার প্রতি যেমন তাগিদ দিয়েছে, তেমনি ছুটি, বিশ্রাম ও অবকাশ গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়েছে। নিম্নে ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের ছুটি ও বিশ্রামের অধিকার নিয়ে কোরআন-হাদিসের কিছু নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—
পরিশ্রমের পর অবসর বের করা : জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। তবে কাজের পাশাপাশি বিশ্রাম ও মনঃসংযোগও প্রয়োজন।তাই সব ব্যস্ততার মাঝে অবসর বের করতে হবে মহান আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়ার জন্য। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। আবার নিজেকেও প্রশান্তি দেওয়ার জন্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতএব, যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদতে রত হও।আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ট হও।’ (সুরা : ইনশিরাহ, আয়াত : ৭-৮)
বিশ্রাম করা : কাজের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় আরাম ও বিশ্রাম করা প্রত্যেক মানুষের অধিকার। মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য আবশ্যকীয় কাজ। এটা মহান আল্লাহর দেওয়া নিয়ম।পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রাম। আর আমি রাতকে করেছি আবরণ। আর আমি দিনকে করেছি জীবিকার্জনের সময়।’ (সুরা : নাবা, আয়াত : ৯-১১)
তাই শ্রমিকের জন্যও নির্দিষ্ট সময় বিশ্রামের সুযোগ থাকা আবশ্যকীয়।
মাঝে মাঝে ছুটি কাটানো : দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মাঝে মাঝে ছুটি কাটানো, পরিবার ও আত্মীয়দের সময় দেওয়া মানুষের জন্য আবশ্যক।শুধু পেশাগত দায়িত্বই জীবন নয়। উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে উসমান! আল্লাহকে ভয় করো! কেননা তোমার প্রতি তোমার পরিবারের হক আছে, তোমার মেহমানের হক আছে এবং তোমার নিজের শরীরেরও হক আছে। কাজেই তুমি সাওম পালন করবে এবং ইফতারও করবে, সালাত আদায় করবে এবং নিদ্রও যাবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৬৯)
অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে, একদিন হানযালাহ (রা.) স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিকে সময় দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে ক্রীড়া-কৌতুকের ব্যাপারে নবীজি (সা.)-কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘হে হানযালাহ! কিছু সময় আল্লাহর স্মরণের জন্য এবং কিছু সময় দুনিয়াবি কাজের জন্য।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৮৬০)
অমানবিক পরিশ্রম পরিহার করা : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৬)
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, ইসলামও এমন কোনো শ্রমনীতি অনুমোদন করে না, যেখানে শ্রমিকের ওপর তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে। তাকে দিয়ে অমানবিক পরিশ্রম করানো হবে বা সে নিজেই অমানবিক পরিশ্রমের পথ বেছে নেবে।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু জুহায়ফাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) সালমান (রা.) ও আবুদ দারদা (রা.)-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। (একদা) সালমান (রা.) আবুদ দারদা (রা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে উম্মুদ দারদা (রা.)-কে মলিন কাপড় পরিহিত দেখতে পান। তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে উম্মুদ দারদা (রা.) বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদার পার্থিব কোনো কিছুরই প্রতি মোহ নেই। কিছুক্ষণ পরে আবুদ দারদা (রা.) এলেন। অতঃপর তিনি সালমান (রা.)-এর জন্য খাদ্য প্রস্তুত করান এবং বলেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি সাওম পালন করছি। সালমান (রা.) বললেন, আপনি না খেলে আমি খাব না।
এরপর আবুদ দারদা (রা.) সালমান (রা.)-এর সঙ্গে খেলেন। রাত হলে আবুদ দারদা (রা.) (সালাত আদায়ে) দাঁড়াতে গেলেন। সালমান (রা.) বললেন, এখন ঘুমিয়ে পড়েন। আবুদ দারদা (রা.) ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবুদ দারদা (রা.) আবার সালাতে দাঁড়াতে উদ্যত হলেন, সালমান (রা.) বললেন, ঘুমিয়ে পড়েন। যখন রাতের শেষ ভাগ হলো, সালমান (রা.) আবুদ দারদা (রা.)-কে বললেন, এখন উঠুন। এরপর তাঁরা দুজনে সালাত আদায় করলেন। পরে সালমান (রা.) তাঁকে বললেন, আপনার প্রতিপালকের হক আপনার ওপর আছে। আপনার নিজেরও হক আপনার ওপর রয়েছে। আবার আপনার পরিবারেরও হক রয়েছে। প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করুন। এরপর আবুদ দারদা (রা.) নবী (সা.)-এর কাছে হাজির হয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। নবী (সা.) বলেন, ‘সালমান ঠিকই বলেছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)













