কয়েক মাস মাস ধরে ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৫টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের কোনো খোঁজ নেই। পরিষদে এসব চেয়ারম্যানদের কার্যালয়ে ঝুলছে তালা। এমনকি উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায়ও তাদের দেখা মিলছে না। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ।
এর মধ্যে চারজন চেয়ারম্যান জেলে আছেন, বাকিরা সব পলাতক রয়েছে বলে জানা গেছে। চেয়ারম্যানদের অনুস্থিতিতে বর্তমানে পরিষদের কার্যক্রম সচিবরা কিছুটা সামাল দিলেও কাঙ্খিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ১৫টি ইউনিয়নের লাখো মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সালথা ও নগরকান্দার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মাত্র একজন ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি হলেন, লস্কারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার।বাকি ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। এর মধ্যে তালমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর আওয়ামীপন্থী এসব চেয়ারম্যানরা পরিষদে কিছুদিন বসলেও সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অপারেশন ডেভিল হান্ট শুরু হওয়ার পর গা ঢাকা দেন তারা। তবে তালমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিয়মিত পরিষদে বসছেন।
এরই মধ্যে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হন সালথা উপজেলা বল্লভদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি খন্দকার সাইফুর রহমান শাহিন। এরপর গত ১১ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হন সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. হাবিবুর রহমান লাবলু, নগরকান্দা উপজেলার পুরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. আতাউর রহমান বাবু (৪৮) এবং ডাঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আবুল কালাম (৬১)। বর্তমানে এই চার চেয়ারম্যান জেলে রয়েছেন।
পলাতক রয়েছেন নগরকান্দার ফুলসুতি ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম, গা ঢাকা দিয়ে আছেন চরযোশরদী ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সাহেব ফকির, কাইচাইল ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা হোসেন খান, কোদালিয়া-শহীদনগর ইউপি চেয়ারম্যান খন্দকার জাকির হোসেন নিলু ও রামনগর ইউপি চেয়াম্যান কায়ুসদ্দীন মন্ডল।
অন্যদিকে সালথায় পলাতক রয়েছেন, সোনাপুর ইউপি চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বাবু, মাঝারদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আফছার উদ্দীন, আটঘর ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম খান সোহাগ, রামকান্তুপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইশারত হোসেন, ভাওয়াল ইউপি চেয়ারম্যান ফারুকুজ্জামান ফকির মিয়া ও যদুনন্দী ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম।
জানা গেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের এমপি প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকুর গাড়ি ভাঙচুর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এসব চেয়ারম্যানদের মধ্যে অনেককেই আসামি করা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সালথার ভাওয়াল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুকুজ্জামান ফকির মিয়ার অস্থায়ী কার্যালয় তালাবদ্ধ। কার্যালয়ের সামনে আব্দুল আলি নামে এক ব্যক্তি পরিচয়পত্রে চেয়ারম্যানের সই নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, পরিচয়পত্রে চেয়ারম্যানের সই নেওয়ার জন্য কয়েকদিন ধরে ঘুরতেছি। কিন্তু চেয়ারম্যানকে পাচ্ছি না। শুধু আমি একা নয়, প্রতিদিন আমার মতো অনেকেই জন্ম নিবন্ধন, নাগরিক সনদ ও পরিচয়পত্রে চেয়ারম্যানের সই নেওয়ার জন্য ঘুরছে।
একই অবস্থা দেখা যায়, নগরকান্দার ডাঙ্গী, পুড়াপাড়া, সালথার গট্টি, সোনাপুর ও বল্লভদীসহ অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদে। চেয়ারম্যানরা না থাকায় তাদের কার্যালয়ের সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সেবাপ্রত্যাশীরা। সোনাপুর ইউনিয়নের সেবাপ্রত্যাশী আয়ুব মোল্যা ও আবুল বাসার কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা নাগরিক সনদ নিতে এসেছি। কিন্তু চেয়ারম্যানকে পাচ্ছি না। তাদের বাড়ি গিয়েও খোঁজ-খবর পাই না। এমনকি তাদের ফোনও বন্ধ।
অন্যদিকে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও বিবিজিসহ বিভিন্ন প্রকল্পের বিপুল পরিমাণে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যানদের অনুস্থিতিতে এসব বরাদ্দের কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চেয়ারম্যান না থাকার সুযোগে ইউপি সচিব, প্যানেল চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা যাতে অনিয়ম না করতে পারে সে জন্য উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাধারণ জনগণ।
সালথার গট্টি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ভাওয়াল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ফয়সাল শেখ কালের কণ্ঠকে বলেন, চেয়ারম্যান না থাকায় সমস্যা তো হচ্ছেই। মানুষ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে বিভিন্ন সেবা নিয়ে থাকে। সেই সেবা থেকে অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছে। তবে চেয়ারম্যানদের সই-স্বাক্ষর প্যানেল চেয়ারম্যানরা দিচ্ছেন। উন্নয়নমূলক কাজও প্যানেল চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ বিষয়ে পলাতক থাকা একাধিক চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের ফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তামলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি নিয়মিতই পরিষদে বসছি। জনগণের সেবা দিচ্ছি। আমার ওপর কোনো ধরনের চাপ নেই। আমি এমন কোনো কাজ করিনি যে, চাপে পড়ব। তবে আমাদের উপজেলার কয়েকজন চেয়ারম্যান গা ঢাকা দিয়ে আছে বলে শুনেছি।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বালী কালের কণ্ঠকে বলেন, চেয়ারম্যানরা উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় আসেন না। আবার পরিষদেও বসছে না বলে জানতে পেরেছি। চেয়ারম্যানরা পরিষদে নিয়মিত অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাফী বিন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, নগরকান্দায় ৩-৪ জন চেয়ারম্যান বাদে সব চেয়ারম্যানই পরিষদে যাচ্ছে বলে জানি। তবে নিয়মিত না। পরিষদের কার্যক্রমে যাতে সমস্যা না হয় ও জনগণ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি।













